সলিল সমাধি Originally posted in Facebook on 11 August 2017-

কলেজ স্কোয়ারে কাজল বাবু তলিয়ে গেলেন। তিনি ছিলেন দক্ষ সাঁতারু এবং সাঁতার প্রশিক্ষক। প্রৌঢ়, কিন্তু এতটা প্রৌঢ় ছিলেননা যে দীর্ঘকালের অভ্যাস — সাঁতার — ভুলে যাবেন। তাঁর বয়সে অবশ্য হৃদ্ যন্ত্রের বিশ্বাসঘাতকতার সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যায়না, বিশেষত সাঁতারের মত শ্রমসাপেক্ষ প্রয়াসের ক্ষেত্রে।

সংবাদে দেখলাম, এর আগেও নাকি হেদুয়াতে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। আমিও হেদুয়ার অন্য একটি ঘটনার কথা জানি, তবে তা ঘটেছিল আনুমানিক ১৯৬৩-তে; আমি তখন কলেজে পড়ি।

কোন একটা ছুটি ছিল। মনে হচ্ছে, প্রথম বর্ষের বার্ষিক পরীক্ষার পর লম্বা পূজাবকাশ; না হলে পীতাম্বর হেদোতে সাঁতার কাটতে যাবে কেন! আমরা ৬২ ব্যাচের উচ্চ মাধ্যমিক, এগারো ক্লাসের। পীতাম্বর দত্তের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সাম্মানিক পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাসে। আমরা এক সঙ্গে দেড়শো জন নিওফাইট ভর্তি হতাম। প্রত্যেক কলেজ পরীক্ষার পর সাম্মানিক ক্লাসের ছাত্র সংখ্যা একটু একটু করে কমত। এলিমিনেশন সিস্টেম। শেষমেশ চল্লিশ কি পঞ্চাশ জনকে পার্ট ওয়ানে অনর্স নিয়ে পরীক্ষা দিতে দেয়া হত। অনর্স চলে গেলে অনুমতি সাপেক্ষে পাস কোর্সে ডিগ্রি খতম করা যেত, তবে কেউ কেউ সে পরিণতির অপেক্ষায় না থেকে অন্যত্র নিজের ব্যবস্থা দেখে নিত। অসংগত ব্যবস্থা, কিন্তু তেমনটাই ছিল রীতি।

কলেজের সামনের ফুটপাথে একেকদিন এক টিক্কা ওয়ালা বসত: ঠেলাগাড়িতে তোলা উনুন, তার ওপর বিশাল একটা তাওয়া। আলু টিক্কার জন্য সেদ্ধ করা খোসা ছাড়ানো আলু, আর মটর সেদ্ধ। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, টোমাটো, কাঁচা লংকা, ধনেপাতা, তেঁতুল গোলা, আর অনেকটা রান্না করা ঘুগনি। আলু আর মটর দিয়ে টিক্কা বানিয়ে তাওয়ায় অগভীর তেলে ভেজে শালপাতায় তুলে দিত অনুপান মিশিয়ে। চৌয়ান্নিতে দুটো টিক্কা। বড্ড এক্সপেনসিভ! মাড়ওয়ারি ছেলেরা খেত তো! আমরা অন্নপূর্ণা ক্যানটিনেই চা খেতাম।

পীতাম্বর একদিন টিক্কা খাইয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেছিল। এক শালপাতা টিক্কার সঙ্গে খালি শালপাতা এক পীস, দুজনের ভাগ।

ছুটির মধ্যেই একদিন শ্রীরামপুরে অশোকনাথ চাটুজ্জের বাড়ি গিয়ে শুনলাম হেদোতে সাঁতার কাটতে গিয়ে পীতাম্বর আর ফেরেনি। কলেজ খোলার পর কেউ বলল সুইমার’স ক্র্যামপ, কেউ বলল ডাইভ দিতে গিয়ে তার মাথা নাকি শানে ধাক্কা মারে। আমরা একটা শোকসভা করেছিলাম ক্রিসচান হস্টেলে। তার পর পীতাম্বরকে একটু একটু করে ভুলে গেলাম সকলে। আজ ২৪ ঘন্টার খবর দেখতে গিয়ে মনে পড়ল পীতাম্বরের হাসিটা।

Advertisements

চিল

চি(চী)ল [বি] সং চিল্ল; হি চীল৷ গৃধ্র জাতীয় মাংসাশী পক্ষিবিশেষ (kite).

kite [n] Large bird of falcon family (esp. the common European Milves Ictiums) with long wings and usu. forked tail.

____________________________
যে চিল নদীর ওপরের আকাশে উড়ে উড়ে কেঁদে বেড়াতো, কখনও আবার কেঁদে কেঁদে উড়তো, তার সঙ্গে এ লেখার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। প্রসঙ্গত, জীবনানন্দের জবানিতে, সোনালি ডানার সেই চিল ধানসিড়ি নদীটির পাশে নাকি উড়তো, অথবা কাঁদত, কিংবা উড়তে উড়তে কাঁদত, কিংবা কাঁদতে কাঁদতে উড়ত; কবি নিজেও নিশ্চিত জানেননা। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে উড্ডীয়মান সেই পাখি আকাশের উপত্যকায় নদী কোথায় পেতো, কিংবা নদীর দুকুল জুড়ে আকাশ, তা বুঝিনি এখনও! গল্পের গোরু যদি গাছে চড়ে তো কবিতার নদী চড়ে গগনপটে। বিস্মৃত কবি অরুণকুমার সরকারও চিলকে নিয়ে রোম্যান্টিক কবিতা লিখেছেন (“ভালবাসা তুমি সুদুর শঙ্খচিল/ অনেক দূরের নীলে,/ আজ মনে হয় হয়ত বা নয় ভুল,/ হয়ত বা ডেকেছিলে), তবে শঙ্খচিল ঠিক চিলের প্রজাতি নয়; কবি কি চিল লিখতে গিয়ে মাত্রার খাতিরে শঙ্খাধিক্য (sic) ঘটিয়েছেন? আর ইঙ্গ-বঙ্গ অভিধানে দেখছি চিলের ইংরেজি কাইট, কিন্তু কাইট আবার চিল না হয়ে পেরিগ্রিন হতে পারে—সেও তো ভিন্ন প্রজাতির পাখি!

চিলেকোঠা, চিলচীৎকার, কাকচিল, ইত্যাকার কিছু কিছু বাংলা ব্যবহারে চিলদের মাঝে মাঝে দেখি। কখনো কয়েকবার পাশের বাড়ির মিঠুদের ছাদে—সিঁড়ির শেষ ল্যান্ডিংটাকে (যেটা একটা গড়ানে ছাদের ছোট ঘরে আশ্রিত) চিলেকোঠা ধরে নিলে, তার মাথায় যেখানে আকাশদীপ বাঁধার বাঁশ—তারও মাথায় চিল বসতে দেখেছি বটে, কিন্তু চিলচীৎকার স্বকর্ণে শুনিনি কখনো। পাড়ার মাসিমা কাকিমাদের জবানিতে দীর্ঘকাল ধরে শুনে আসছি, বারোয়ারি কাজের মহিলা অমুকের মায়ের ঝগড়ার চোটে সে তল্লাটে কাকচিল বসতো না, কিন্তু কখনো কাক আর চিলকে একত্রে বা একাসনে বসতে দেখেছি বলে মনে পড়েনা।
আমার ক্লাস ফাইভের সহপাঠী চম্পার চিকন কন্ঠে চিলচীৎকার শুনেছি অনেক, কারণে ও অকারণে। সেই সব ক্লাসে, কিংবা তারও আগে, ‘এক থাল সুপারি, গুনতে নারে ব্যাপারী, বলে ফেলো যে পারে’, ‘বি.এ.টি.এ. কি হয় রে?’ আর ‘কয় চিল উড়তে পারে না?’ জাতীয় ক্ষণস্থায়ী ধাঁধার প্রচলন ছিল। সত্যিকারের চিলের চীৎকার আমি কখনও শুনিনি। সে যুগে সুকুমার দে সরকারের জঙ্গুলে গল্পের চিলেরা ‘কিইইরর কি কি চীঈঈ” বলে চীৎকার করত—ছাপার অক্ষরে দেখেছি। আরো শুনতাম, রেণু এবং রেণুর মায়ের কলহমুখর চীৎকার, পেছনের কলতলায়, যেখানে চার ফ্ল্যাটের পোড়া বাসন মাজা হত। মা বলতেন, “ওদের জ্বালায় পাড়ায় কাকচিল বসতে পারে না!” তা ছাড়া আমার নিস্তরঙ্গ জীবনে চিলেরা সীমিত উপস্থিতি নিয়েই খুশি ছিল।

এই কলকাতা শহরের আকাশে যারা যথেচ্ছ বিচরণ করতো, এবং আমার বালক বয়সে একাধিকবার বিনা প্ররোচনায় যারা ছিনিয়ে নিয়েছে শালপাতার লাইনিং দেয়া কঞ্চির চাঙারি, যে চাঙারিতে ছিল বাড়ির সকলের জন্য রবিবারের সাতসকালে কাঙ্খিত কচুরি ও জিলিপি, তারাই এ লেখার অপ্রত্যক্ষ কুশীলব। কলকাতার সেই চিলেরা, হায় (কবির অন্য এক কবিতার শিরোনামের অব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিন এই বিলাপ), দীর্ঘকাল বিলুপ্ত। শালিক এবং মানুষঘেঁষা চড়ুইদের নিয়েও এমন হুতাশ উঠেছিল কয়েক বছর আগে; জ্যামিতিক গতিতে ক্রমবর্ধমান সেলফ়োন টাওয়ার নিঃসৃত অনর্গল তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণের জন্যই নাকি সে সব চির-চেনা প্রজাতির বিলুপ্তি। ইদানীং দেখছি, বিকিরণ উপেক্ষা করে চড়ুই-শালিক ফিরে আসছে একে একে। কদিন আগে রবীন্দ্র সরোবরের এক নিমগাছে স্বচক্ষে দেখেছি একটা নীলকন্ঠ পাখি। চিলেরা তবু এখনো অধরা, এবং অদৃশ্য তাদের স্বজনপ্রতীম সেই শকুনকুল, যারা দুগ্ধবর্ধনে অর্থলোভী গোয়ালার দ্বারা টিকায়িত মৃত গবাদি খেয়ে লুপ্ত!

আমরা যারা চুঁচড়ো শহরের কলেজিয়েট স্কুলে পড়েছি (আমার ক্ষেত্রে ১৯৫৭-তে সাত ক্লাস থেকে ১৯৬২-তে এগারো ক্লাসের উচ্চমাধ্যমিক পাস করা পর্যন্ত), মফস্সলি চিলেদের অন্য এক চরিত্র প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। সেই সব চিল কেমন করে যেন কাঁটায় কাঁটায় টিপিনের সময় জানতে পারতো। বড় টিপিনের আগে ভূপেশবাবুর ক্লাস কিছুতেই শেষ হতে চাইতোনা। তাঁর পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণ ও সিনট্যাক্সে জর্জরিত আমাদের চোখ ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছে। এমন সময় পাশ থেকে সুধীর দৈববাণীর মত বলে উঠলো, “ওই তো চিল!” সুদুর নৈহাটি থেকে গঙ্গা পেরিয়ে আসতো তারা; মাঝনদী পেরুতে না পেরুতে ঢং ঢং করে শুকুলচাচার ঘন্টা বেজে উঠত বেদ মন্ত্রের মতো। মাসিক দশ আনার বাধ্যতামূলক টিপিনে তখন পাওনা ছিল হয় একটা নিমকি, সঙ্গে দানাদার, নয়তো সিঙারা আর জিলিপি, অথবা তদ্রূপ কোনো কম্বিনেশন। এমন কিছু ফেলনা জিনিস নয়। আমরা অনেকেই সোনামুখ করে খেতাম। কিন্তু চিলেদের দাবি উপেক্ষা করার উপায় বোধহয় আমাদের ছিলনা। হাতের খাবার দু ভাগে ভেঙে ছুঁড়ে দিতাম মহাশূণ্যে; মাটিতে পড়তে পেতনা। যে ভাবে দূর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফ্লাইং ক্যাচ নিত তার ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশ যদি গোলাম আহমদের টেস্ট টিম আয়ত্ত করতে পারত তবে তদানীন্তন (১৯৫৮-৫৯) অ্যালেকজ়ান্ডরের ওয়েস্ট ইন্ডিজ় হালে পানি পেত না।

বঙ্গ-বঙ্গ অভিধান (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়) বলছে যে চিল নাকি “গৃধ্রজাতীয় মাংসাশী পক্ষিবিশেষ (kite)” এবং চিল্ল নাকি তার মধ্যযুগীয় সংস্কৃত রূপ। তা হবেও বা! কোকিল এবং কাক-শালিক-চড়ুই নিয়ে আমরা যত আলোচনা করি, তার সিকির সিকি ভাগও সচরাচর চিলের পেছনে খরচ করিনা। এই লেখা সেই অনালোচিত ও কাব্যে প্রায়োপেক্ষিত, ঊর্মিলার মত চিলেদের নিয়ে। সমস্ত দিনের শেষে যে চিল ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে, অবশ্যই সে এই লেখার মুখ্য চরিত্র। তবে, জীবনানন্দ কি করে তার ডানার গন্ধ শুঁকলেন, স্বয়ং কেঁদে কেঁদে উড়তে উড়তে, না উড়ে উড়ে কাঁদতে কাঁদতে, তার মীমাংসা করবে কে!

কলকাতা থেকে যারা বেমালুম হারিয়ে গেছে, আর হারিয়ে না গেলেও নৈহাটি-চুঁচড়োর সেই টিপিনলোভী চিলেরা অবশ্যই ক্ষয়িষ্ণু; কলকাতার কাছাকাছি যে চিলেদের বাস তারা বাঁশের চাঙাড়ি হাতে বালকদের এখনও আক্রমণ করে কিনা জানিনা, তবে তারা সবাই, যে যেখানে থাকুক, আকাশে উড়তে উড়তে রোদ্দুর মাখে তাদের সোনালি ডানায়। তাদের ডানার রঙ সত্যিই সোনালি কিনা হলপ করে বলতে পারব না। আমার ধারণায় রঙটা বর্ণনাতীত কপিশ (তাম্রলোহিত)। সমুদ্রতীরের সিকতাবিস্তারে সুন্দরীরা যেমন প্রায় নগ্ন শরীরে রৌদ্র স্নান করে, তেমনি ভঙ্গিতে আয়ত ডানা মেলে আকাশবিস্তারে ভাসত তারা, সুন্দরীদের মতই স্থির, তাদের মতই গ্রেসফুল।

বড় হয়ে বনলতা সেন পড়ার ঢের আগে ‘রৌদ্রের গন্ধ’ সম্বন্ধে একটা ধারণার অঙ্কুর জন্মেছিল বালক মনে। কোম্পানির সান-বারান্দাওয়ালা দোতলার ফ্ল্যাট—শা’গঞ্জ ১১৬ নম্বরে—বাস করবার সময়, পেছনের টানা বারান্দায় আমাদের কাপড় শুকোত। বছরভরই তাই। কিন্তু নির্মেঘ রোদ্দুর কি সারা বছর থাকে! একেকদিন আমার নিজস্ব তুর্কি তোয়ালেতে একটা গন্ধ পেতাম। সাক্ষাৎ টার্কি থেকে আনা পেডিগ্রিদার তোয়ালেটা দিয়েছিলেন শান্তি জ্যেঠি আর নিলুজ্যাঠা (সত্যেন সেন, যিনি শেষ দিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন)।

কখনও বিকেলে, কখনও ভোরে, সেই তোয়ালেতে মুখ গুঁজে একটা অপার্থিব গন্ধ পেতাম, যেন বসফরাসের ওজোনসমৃদ্ধ ঝকঝকে হাওয়ার গন্ধ পাচ্ছি। বুকভরা, মাতাল করা সে গন্ধ রোজ পেতাম না। রবীন্দ্রনাথের ঢঙে অনেক ভেবেছি, ‘মাঝে মাঝে গন্ধটা পাই, চিরদিন কেন পাই না?’ ….অবশেষে একদিন বুঝলাম, গন্ধটা রোদ্দুরের। ছেলেবেলার অনেক একাকী আবিষ্কারের মত এটাও আমার মনের অতলে লুকিয়ে ছিল, যদ্দিন না বনলতা সেন পড়লাম—সম্ভবত কলেজের প্রথম বর্ষে।
তখন বুকের মধ্যে অঙ্কুরিত হচ্ছে নতুন, জটিল সব অনুভব; পাখির নীড়ের মত চোখ আবছা আবছা বুঝতে পারছি; সব পাখির, সব নদীর ঘরে ফেরা; গল্পের জন্য জোনাকির আলো ঝিলমিল—মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি আবছা; আর তারই মধ্যে ছিল সন্ধ্যাগমে ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে যে চিল, তার কথা।

আজকের এই এঁদো কলকাতার অকটোবরে হঠাৎ পেলাম হারিয়ে যাওয়া সেই গন্ধটা, যুগের ওপার থেকে সে মনে করিয়ে দিলো বসফরাসের কথা, শান্তি জ্যেঠির নিলু জ্যাঠার কথা, আমার জীবনের বেশ কয়েকটা ফেলে আসা অধ্যায়ের কথা। তার দুয়েকটা অধ্যায় অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল। যেমন ১৯৬৫তে বাবা মারা যাবার পর আমার কৈশোরের শেষ কয়েকটা পাতা কারখানার কঠিন শানে লেখা হয়েছিল …. অযুত পদপাতে তারা নিঃশেষে মুছে গেছে।

ধ্বক করে মনে পরে গেল সেই বহু দিন আগের পড়া বনলতা সেন। চকিতে বুঝলাম, জীবনানন্দ তাঁর লাল গামছায় সেই একই গন্ধ পেয়েছিলেন—চিলের ডানার থেকে নয়!

ও গেরস্ত, কে কি দিবি

একটা মানুষ অনেক হেঁটেও এগুতে পারছে না —

পেখমবাহার মিছিল ছাড়া চলা অসম্ভব

জেনেও একা হাঁটছে, আর ভাবের ঘরে দেনা

বাড়তে দেয়া উচিত নয় বলে এ অভিযান।

গন্তব্য এখনও বহুদূর!

একা চলার অনেক দায়। বুকজোড়া সাহস,

অদম্য জেদ পাথেয় করে বিজন কুচকাওয়াজ

কে দেখছে আর কে দেখছেনা পরোয়া নেই কারু।

মনে তাগিদ জেগেছে বলে মধ্যদিনে আজ

আড়বাঁশিতে বাজায় আশার সুর।

পথ চলতে দেখনহাসি মাধুকরীর হাত

বাড়ানো তার; নয়ানজুলির ওপর একটা সাঁকো,

থমকে আছে নোংরা জল, মোষগুলো চিৎপাত,

বাঁশ পাতা সে সাঁকো পেরিয়ে দরাজ গলায় ডাকে,

“ও গেরস্ত, কে কি দিবি আয়!”

ভোট চাইলে ভোট মিলবে, চাল চাইলে চাল

পেতেও পারে, চাকরি চাইলে হাত করবে উপুর;

কিন্তু মাধুকরীর চাওয়া বিষম গোলমাল —

ঠিক কি চায় বুঝতে বুঝতে কাটবে গোটা দুপুর;

গেরস্তদের ভাত ঘুম পালায়৷

প্রতিরোধের ইচ্ছেটুকু দিও

দিও বাঁচার মত করে বাঁচার বাসনা

গড্ডালিকায় না গিয়ে, সুপ্রিয়,

দিও তোমার সকল সম্ভাবনা –

পা না মিলুক, তুমিও হাঁটো একা!
Continue reading “ও গেরস্ত, কে কি দিবি”

আবরু

যেতেই হবে তাদের যারা বাহির পানে চায়,

যেতেই হবে তাদের যারা না বেরুলেই খিদে;

আদিগন্ত ধুধু রোদে ক্ষিপ্ত বারান্দায়

স্বল্প ছায়ায় ধ্বস্ত মায়ায় আবরু ঢাকে নিজের।

আকাশে রোদ, ফ্যাকাশে রোদ, একা সে রোদ মেখে

গামছা মাথায় নাচার পথিক টিপকলে চাপ একা।

আবরু বলতে ক-ফোঁটা ঘাম,

আবরু বলতে একটু আরাম!

আমারই দোষ, আমারই দোষ, আমার মর্জি মত

এই গৃহান্তে নকল ঠান্ডা, ঝাপসা হাওয়া, পেরি মেজ়ন;

আবরু বলতে চারটে দেয়াল,

আবরু বলতে নিজের খেয়াল,

আবরু বলতে অবসরের জীবন কাটায় যে জন।

[মূল পোস্ট জুন ১, ২০১২; aniruddhasen.wordpress.com থেকে স্থানান্তরিত]

প্রচলিত ছড়া ও তার ইংরেজি তরজমা

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এলো বান,
শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো, তিন কন্যে দান।
এক কন্যে রাঁধেন বাড়েন, এক কন্যে খান,
আরেক কন্যে গোসা করে বাপের বাড়ি যান।


Pitter patter raindrops, the river is in spate,
Shiva weds three lasses on that very date.
One cooks well, the other eats, and the third is very cross…
Off she goes to mama’s house wading through the slosh.


এটিউড ২

লেকের গহনে আজ দেখলাম ধূসর পূর্ণশশী।

আজ ছুটি ছিল জৈনগুরুর আগমন দিন বলে —

তাই তো বেঞ্চে জোড়ায় জোড়ায়

আসঙ্গলোভী যুগল। গোড়ায়

ভুল করে যাকে জোড়া ভাবলাম আসলে  সে একাকিনী।

অঙ্কের কাছে হাত জড়ো করে আকাশে তাকিয়ে আছে;

লেকের ওপারে যত আলো, আর যত জোনাকিরা কাছে,

কিছু দেখছে না, যেন তার চোখে সুদূরের হাতছানি…

এখন বোধহয় জানি

আসলে যে তার পূর্ণিমা নয়, নির্জলা একাদশী!

এটিউড ১

এখানে কেউ নীরবে হাঁটে, অনেকে হাসে হা হা;

বাতাস নেই, গলদঘর্ম, অগ্নয়ে যে স্বাহা!

এখানে কেউ সতেজ চারা,

বেশির ভাগই সৃষ্টিছাড়া,

লোলচর্ম, গলিত নখ, বয়স যাদের ছিল;

এখন দেখি সে সব মেকি

আসলে তলে তলে

নিস্তরঙ্গ বেনো জলে যতই ফেলো ঢিল, ও

চশমা ঢাকা শুগার ড্যাডির চোখের পেকাডিলো!

[হঠাৎ একেকটা কবিতার লাইন বিনা চেষ্টায় মাথায় আসে; সেটা পূর্ণ কবিতা হবে কিনা কেউ জানে না। কখনও আবার হাজার চেষ্টা করেও দুটো লাইন বেরোয় কি বেরোয় না; যদি বা বেরোয়, তা পূর্ণতা পায় না আদপে। এই দুই ধরণের ভ্রূণধর্মী চূর্ণ কবিতাকে নানা লোকে বিবিধ নামে ডাকে। আমি এটিউড বললে ক্ষতি কি?

কৈশোরের দম্ভে একদিন লিখেছিলাম, যদি ইচ্ছা করো/ ঈশ্বরবাগের সব মাছেদের/  চন্দনপুরের সব পাখিদের/ রাজা হতে পারি! পূর্ণ হোক বা চূর্ণ, আস্ফালনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে  সন্দেহ থাকে না। মানে বোঝানোর দায় তো কবির নয়! এই পর্যায়ের চূর্ণ কবিতাগুলোকে আমি কাব্য চেষ্টার ভ্রূণ কিংবা ব্যর্থ মুসাবিদা বলে ভাবি। সে গুলো নথিভুক্ত করার জন্য এই ব্লগ পোস্ট।]