বাঙালির শখ: ঘুড়ি ঘুড়ি (এক)

শখ আর নেশার মধ্যে বিস্তর ফারাক৷ মদ বা নারীসঙ্গের শখ  এক-আধবার হতে পারে, কিন্তু তার নেশা সচরাচর দীর্ঘস্থায়ী। টাকা জমানোটা নিছক নেশাই, অনেকের ক্ষেত্রে আবার পেশাও, কোনওদিন শখ হতে পারে না। ডাকটিকিট, মুদ্রা বা দেশলাইয়ের খোল জমানো অবশ্যই শখ পদবাচ্য, আবার নেশা হতেও বাধা নেই। ক্ষেত্র বিশেষে নেশা আর শখ  একাকার হয়ে যায়, আলোকচিত্র গ্রহণ ও পরিস্ফুটন নিয়ে আমার বাবার যা হয়েছিল।…

ছাঁপোষা বাঙালির শখের দৌড় আজ খুবই সীমিত; চিরকাল তা ছিল না মোটেই। উত্তর কলকাতা ছাড়া বহির্বঙ্গেরও অনেকেই পায়রা পুষতেন; তারা রাধাকেষ্ট জাতীয় শেখানো বুলি কপচাতো না বটে, তবে ময়না-হীরামন-কাকাতুয়ার চেয়ে সস্তা আর বখেড়াও ঢের কম। বেঙ্গল রোড টেরিয়ার অথবা গ্রেট ইন্ডিয়ান স্ট্রাসহুন্ড পুষলে এঁটোকাঁটাতেই খোরাকির যোগান চলে, চাই কি কুমড়োর ঘ্যাঁট বা লাউশাক চচ্চড়িও তারা সোনা মুখ করে খায়,  নিখরচায় বাড়ি পাহাড়া দেয় চমৎকার, আর চীৎকারে কাক-চিল তো বটেই, অবাঞ্ছিত অগন্তুকেরাও অযথা নাক গলাতে ভয় পায়, একান্ত বাঞ্ছিতজনও প্রায়ই রণে ভঙ্গ দিয়ে সম্পর্ক ছেদ করেন। অধীনের ধারণা বুদ্ধিমত্তায় তারা বেশির ভাগ পেডিগ্রিধারী উপজাতিকে টেক্কা দেয়। তবে সেসব পুষ্যি বোধহয় শখ পদবাচ্য নয়, চলন্তিকাও সেরকম কিছু বলেনি।

ব্যতিক্রম হিসেবে বলতে পারি, শান্ত-শিবের মা মিনির (তাকে আমি মিমি বলে ডাকতাম) মার্জার শখের কথা: হুলো আর মেনি মিলিয়ে দু-তিন ডজন বেড়াল ছিল একদা, এক-আধ ডজন বেশিও হতে পারে, সে কথা আমার বেশ মনে আছে। তারা ভালবাসার পুষ্যিও বটে, শখেরও নিশ্চয়, তবে খুব বেশি দিন টেঁকেনি বলে (যমজ যুগলের জন্মের পরেই সে শখ প্রশমিত হয় বলে শুনেছি) হয়ত আর্ষপ্রয়োগ  বলা যেতে পারে।

হাতলাট্টু আর গুলি আমার ছেলেবেলাতেও রমরম করে চলত, ছেলেদের ইশকুলের আসেপাশের দুয়েকটা দোকান ল্যাবেনচুষের (অগডেন ন্যাশ যেমন বলেছেন, ক্যান্ডি হয়ত বা সত্যিই ড্যান্ডি, তবে চুষ্য  বলে এই সাবেক চলতি বাংলাটা ক্যান্ডির চেয়ে অনেক বেশি লাগসই) সঙ্গে কাচের বয়ামে কাচের গুলি রাখত, তাকালেই নজর কাড়ে এমন তাকের ওপর লাট্টু। আমার পছন্দের দোকান ছিল কোম্পানির সিনেমা হলের পেছনে মুন্সির দোকান: সেখানে ভুজিয়া, কাঠি ভাজা, বাদাম, ঝাল ছোলা, ছোলা টোপা, বিবিধ আচার আর রকমারি ল্যাবেনচুষের সঙ্গে ছোট গুলি, প্রমাণ গুলি, সাদা টল তো পাওয়া যেতই, আর সাজানো থাকত আধখানা করে কাটা আলুতে গাঁথা হরেক লাট্টু।

তবে সকলের সব শখ থাকলে নাকি সংসার অচল! এবং আধুনিক আধানাগরিক জীবনে স্বাভাবিক লোকের এক গুচ্ছ শখ থাকতে নেই, থাকতে পারে না, থাকা শুনেছি উচিতও নয়; আমি বোধহয় সে নিয়মের ব্যতিক্রম ছিলাম — সাহেবদের ভাষায় অ্যাটাভ়িস্টিক থ়্রোব্যাক। ডায়ানা এয়ার রাইফ়ল দিয়ে লক্ষ্যভেদ (এবং, সসংকোচে বলি, কয়েকবার কয়েকটা নিরীহ পাখিও মেরেছি, যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্ আবৃত্তি না করেই), ঘুরে ঘুরে ডাকটিকিট ও মুদ্রা সংগ্রহ, লাট্টু, গুলি, ঘুড়ি, মাছ ধরা এবং, পরবর্তীকালে, অবশ্যই আলোকচিত্র … এর সবকটা আমার শখ পদবাচ্য ছিল একটা বয়স অবধি। তাই হয়তো সঞ্চিত পাপে আজও আমার সংসার চলতেই চায় না। এখনও যে গুচ্ছের ক্রসওয়ার্ড করে দিনের অনেকটাই ব্যয় করি, সেটা শখ নয়, নেশা — অহিফেনের চেয়ে বেশি মাদক, অনেকটা এল.এস.ডি.র মত হ্যালিউসিনেটরি। একটা পার্থিব নেশা শারীরিক কারণে ছেড়েছি, অন্যটা বেকার জীবনে অর্থনৈতিক কারণে অনৈমিত্তিক, তবু এই নেশাটা ছাড়তে পারিনি এখনও।…

গুলি বা লাট্টু আসলে জিত্তালের খেলা; মায়ের দিক থেকে পারিবারিক বেম্মোপনার দরুণ এবং পিতৃকুলের অপ্রয়োজ্য ও দিগভ্রান্ত স্বদেশিয়ানার ঠেলায় তাস-পাশা-ঘোড়দৌড়-জিত্তালে কঠোর নিষেধ ছিল, কারণ সেসব বদখেয়াল (ঘোড়দৌড় না হয় বুঝলাম, তবে তাস-পাশা-জিত্তাল ইত্যাদি কি সব সায়েবদের খেলা?), এবং কার্যত জুয়া! খেলবে তো খেলো তবে জিত্তাল নৈব নৈব চ; এ যেন সাঁতার কাটার সম্যক সনদ দিয়েও চুল ভেজানোর অধিকার কেড়ে নেয়া! এখন চোখ রাঙাবার লোক কেউ টিঁকে নেই, তাই নির্ভয়ে বলি, লুকিয়ে চুরিয়ে জিত্তাল খেলতাম।

হুগলি ইমামবাড়ার উল্টোদিকে দর্শনার্থী রাহীদের জন্য একটা অতিথশালা ছিল; সেখানে প্রায়ই থাকতো একদল কুসীদজীবী কাবুলি। তাদের কাজ স্থানীয় কলকারখানা ও সরকারি আপিসের মাসমাইনে বা হপতাকাবারির দিনগুলোতে। বাকি সময়টা তারা অতিথশালার সানবাঁধানো উঠোনে গুলি খেলে কাটাত। আমরা অভ্যাস করেছি ঘাসহীন মাটিতে নটি বয়  জুতোর গোড়ালি দিয়ে পিল-গাব্বু কেটে; অসমান মাটি, এবড়ো খেবড়ো পিল, না-দাগানো কোট (তাকে কোর্ট বলত না কেউ); তাদের দেখি সানের ওপর স্থায়ী পিল-গাব্বু, হালকা করে কোট কাটা, আমরা যে দূরত্বের পিলে খেলতাম তার চেয়ে ঢের বড় — হয়ত দুগুণ কি তিনগুণ। এক বন্ধুর প্ররোচনায় দু-একবার ইস্কুল ফিরতি (তখন আরেকটু উচু ক্লাসে পড়ি) তাদের সঙ্গে গুলি খেলেছি। তারা ছিল পেশাদার গুলিবাজ — যেমন টিপ, তেমনি আঙুলের জোর — প্রতিপক্ষের ওজন দেখে স্ট্র্যাটেজি আঁটতো। এক দিন আমার সব গুলি জিতে নিয়ে দ্বিতীয় মোলাকাতে গুনে গুনে নোংরা রুমালে বাঁধা সব গুলি ফেরত দিয়েছিল; ফাউ হিসেবে কিছু মোক্ষম গুলিবাজি শিখিয়েছিল না চাইতেই।

লাট্টুর জিত্তালে পৌঁছতে নিখাদ নিষ্ঠা লাগে; এতটা নিষ্ঠা ছিল না বলেই খুব বেশি দূর গড়ায়নি সে শখ, তবে হাত লেত্তি, উড়ান লেত্তি, হাত লেত্তি করে ঘুরন্ত লাত্তুটা টান করা লেত্তির ওপর এদিক সেদিক গড়ানোর কায়দা দিব্যি শিখেছিলাম।

Advertisements

5 thoughts on “বাঙালির শখ: ঘুড়ি ঘুড়ি (এক)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s