আমিষাশী বাঙালি ও হিন্দুত্ব

না, জীবনানন্দের আমিষাশী তরবার  পর্যায়ের কবিতার সঙ্গে এ লেখার কোনও সম্পর্ক নেই, অবশ্য ছোটখাটো তরবার দিয়েই সব আমিষের প্রস্তুতি। সবাই জানে, আমরা মাছেভাতে বাঙালি; প্রাকৃতপৈঙ্গলের সাক্ষ্যে যে নালতে শাক আর মৌরলা মাছ (গাওয়া ঘি আর খাঁটি দুধ প্রাপ্তি ও সঙ্গতির অভাবে এবং সঙ্গত কারণেই বাদ), তার সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, লঙ্কা, টোমাটো, মাশরুম, খোকা মকাই, সবুজ ফুলকপি, লাল বাঁধাকপি ইত্যাকার যাবনিক উপাদান। অতি সাম্প্রতিক কালে তথাকথিত চাউ-মানচুরিয়ান-চিলি চিকেন-পিৎজ়া-পাস্তা ইত্যাদিরও যতটা যথেচ্ছ অনুপ্রবেশ ঘটেছে ও ঘটে চলেছে, তাতে অখন্ড ভারতের সীমানা লঙ্ঘনকারী পাকিস্তান ও চিনের লজ্জা পাওয়া উচিত। আরো কেউ কেউ নাকি বলেছেন, ‘রসেবসে’ বাঙালি; রস’টা সত্যি, বস  না হয়ে বশ (বা বশংবদ) হলে যুগ্মবিশেষণটা মানানসই হত, যদিও আজকের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট লজ্জার। আমার ধারণা, ‘আঁশেরসে’ দ্বিত্বটা বেশি লাগসই।

আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ফিউশনে বিলক্ষণ আপত্তি আছে, তাই তিনি ভবানীপুরের অধুনাবিখ্যাত চকোলাভ়া সন্দেশ বা বেক করা রসমালাই ছুঁয়েও দেখেননি। তিনি কি ভেবে দেখেছেন যে ফিউশন না হলে আমরা কি খেতাম! পৈঙ্গলিক ঘিভাতে লঙ্কা না ডললে, বা মুড়ির সঙ্গে পেঁয়াজ না থাকলে, অথবা ভাতের পাতে ডাল না থাকলে তাঁর নিজের কি একদিনও চলবে? আর বৈধব্যের আলু, ভোগের লুচি, ডাক্তারের পরামর্শে আটার রুটি, আপেল-আঙুর-পেঁপে-কমলা লেবু দিয়ে ফলার, তাতে কিঞ্চিৎ সাবুদানা? কয়েক বছর আগেও বাঙালির চাঁদা মাছ চলতো কিন্তু পমফ্রেট নৈব নৈব চ; সুরমাই (ম্যাকারেল) মাছের নামই শোনেনি কেউ; যে লৈঠ্ঠার কপালে শুঁটক্যায়নের কুঞ্চিত নাসা ছাড়া কিছু জোটেনি, তারাও এখন কাঁচাতেই জাতে উঠেছে।

এই অধমের ছেলেবেলায়, অর্থাৎ যতদিন ঠাকুরদা ঠাকুমা জীবিত ছিলেন, কলকাতার বাড়িতে রামপাখি নিষিদ্ধ ছিল, অধিকন্তু পাঁঠা (বিশুদ্ধ বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও) হেঁসেলে ঢুকত না — উঠোনে মেটে হাঁড়িতে পাঁঠা রাঁধলে ও রম্ভই পত্তা-য় খেলে অবশ্য দোষ বর্তাত না। অষ্টমী পুজোর দিন প্রসাদী পাঁঠার নিরামিষ ঝোল রান্না হত মাটির হাঁড়িতে, পেঁয়াজ রসুন বিবর্জিত, শুধু আদা-জিরে-ধনে-মৌরি-হলুদ বাটা আর এক চিমটি হিং দিয়ে। আজকাল তো পাঁঠাই দেখি না, তার আবার বাঙালি-অবাঙালি! চতুর্দিকে শুধু রেয়াজি খাসি — অপৌরুষেয় — তারা কোথায় রেয়াজ করে কে জানে; এতো চর্বি যে কোলেসটেরলের দোকান দেয়া যায়!

অথচ, প্রত্নখনকের শাবলে-কোদালে এই বাংলার মাটিতেই যে প্রস্তর ও তাম্রাশ্মীয় যুগের সাক্ষ্যসকল এযাবৎ পাওয়া গেছে, তাতে দেখি, জনবসতির জঞ্জালের গাদায় বিবিধ পশুপাখির হাড় — মৃগ(অবশ্য, সবই তো মৃগ)-ছাগ-বৃষ-বরাহ-টিট্টিভ-কুক্কুট কিছুই বাদ নেই৷ আর গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ তো সেদিনের ইজ়ম! এখনও দেখি, যাঁরা আমাদের নৃতাত্ত্বিক পূর্বপুরুষ সেই অস্ট্রোএশিয়াটিক জনজাতির মধ্যে শুয়োর-মুরগি-হাঁস পোষার ঝোঁক; তারা আবার ইঁদুর বাদুড়ও খায়৷ সেখানে তো আর ধর্মের দোহাই দিয়ে উল্টো পাল্টা বোঝানো যাবে না! এই স্তবকের উদাহরণের ফর্দে মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী ইচ্ছে করে বাদ রেখেছি; নদীবহুল বাংলার (দাগানো সীমার এপার ওপার মিলিয়ে) বেশ খানিকটা আবার সমুদ্রতটবর্তী। মাছ-চিংড়ি-কাঁকড়া-গেঁড়ি-গুগলি আমরা খাব না তো খাবে কে? কাঠুয়া-কচ্ছপের কথা তুললে আবার পুলিশ ধরতে পারে!

করমন্ডল তটে দক্ষিণী বামুন ছাড়া আর কারু মেছো হতে বাধা নেই। মালাবার তটের মধ্যভাগে নৈরামিষ্যের ধ্বজাধারী যাঁরা তামাম ভারতের ওপর হিন্দুত্বের ছড়ি ঘোরাবার প্যাঁচ কষছেন, নিজেই ভেবে দেখুন, তাঁরাই আসলে অড-মেন-আউট এবং, সম্ভবত, বহিরাগত। কত দিন আগে থেকে ঘাসপাতাভুকরা ভারতে দাপাদাপি শুরু করেছেন? বেদ-উপনিষদের পরে তো বটেই, সম্ভবত শ্রমণধর্ম সকলেরও পরে। সিদ্ধার্থ মোটেই জীবাহার বর্জনের উপদেশ দেন নি; তাঁর মৃত্যু হয় বরাহের পচা মাংস খেয়ে। আসলে তাঁর লিভার ভালো ছিল না মোটে, অতীতে তাঁর জন্ডিসের চিকিৎসা করেছিলেন জীবক ডাক্তার। মহাবীরের নিজের এ সম্পর্কে কি ধারণা ছিল, তার সমসাময়িক কোনও দলিল নেই; অর্বাচীন দস্তাবেজগুলো সম্ভবত শ্বেতাম্বর-দিগম্বরদের জাল। চার্বাক নামধেয় যেসব নাস্তিক মুনি ছিলেন, তাঁরা ধার করে ঘি খেতে বলেছেন বটে তবে আমিষ খেতে নিষেধ বোধহয় করেন নি। (দুধ-কলা দিয়ে সাপ পোষার অলীক গল্প শুনেছেন নিশ্চয়ই; সে যে নেহাৎ গাঁজাখুরি, নিরামিষপন্থীদের কল্পকাহিনি, তাও এতোদিনে জেনে ফেলার কথা — গুজব ফাঁদার জন্য মুখিয়ে থাকে তারা!)

তবে এঁরা কেউ বাঙালি ছিলেন না; সাপেরাও অধিকাংশ অবাঙালি৷ বাঙালি যে আবহমানকাল আমিষাশী, তাতে কারু কোনও সন্দেহ নেই; মধ্যযুগের সন্তবাহিত যে নিরামিষ হাওয়া বাঙালির পালে লেগেছিল, সেটা শতকরা হিসেবে নগন্য — তখনও যেমন, এখনও তাই।

তবে গভীরতর এক আন্তর্জাতিক ষড় অর্থনীতিকে যে পথে চালিত করছে, তাতে অচিরেই গরিব বাঙালিকে মাছমাংস ছাড়তে হবে, আর সিন্থেটিক যে গোমাংসের লোভ বিদেশী বিজ্ঞানীরা দেখাচ্ছেন, তার নগদ মূল্য আমাদের জাতীয় তহবিলের পক্ষেও বড্ড বেশি। তাই নালতে শাকই সই!

Advertisements

21 thoughts on “আমিষাশী বাঙালি ও হিন্দুত্ব

  1. Fascinating reading this post. Many of the socio-economic nuances you write are similar to my background of NO CHICKEN NO ONION NO GARLIC regime which is unbelievable to the Y generation of the family. I was intrigued to see how Chinese worshippers offered roasted baby pigs to Buddha when I arrived in Singapore in early 1970 but never knew he died of this. Thank you for enlightening us that Mackerel has a Bengali name. This fish curried with fresh mustard had proven to be a great winner for my wife for decades with Aussie friends !!!I have long as that has bee

    1. Thanks for reading my posts, patiently enough to offer interesting comments. Surmai is the west coast (Mumbai, Goa) name for mackerels of a certain size range; smaller and larger versions are described by different handles — thus making classification easier. We, on the east coast, have chosen the name for the medium size, for that’s all we have inured ourselves to so far. মাছের সর্ষেবাটা has been an all time favourite for wasabi-trained Japanese gentry. My wife’s cooking was in great demand with them whenever they descended to Sahaganj in hordes. So was মিষ্টি দই and বলরামের জলভরা.

    1. পড়ার ও মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ। আমার পোস্টের পাঠক সংখ্যা বড্ড কম, তাই এমন মন্তব্য পেলে চমকে যাই। বাঙালি, আপনার কথামত, খাদ্যরসিক ছিল, অবশ্যই, তবে ক্রমশ দেখি রসভঙ্গ হচ্ছে! গৃহিনীরা রাঁধতে ভুলে যাচ্ছেন, প্রাতিষ্ঠানিক খাবার দাবার অগ্নিমূল্য, তথাকথিত ফুটপাথের খাওয়া এখনো সস্তায় যথেষ্ট পুষ্টিকর তবে গৃহগত নিষেধাজ্ঞার জন্য স্বভাবরসিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। পুনর্বার ধন্যবাদান্তে নমস্কার!

  2. বেশ লাগল। আমিষ খাওয়া নিয়ে আমার দক্ষিণী সহকর্মীদের সঙ্গে ঝগড়া ঝাঁটি হত প্রায়ই, কিছুদিন আগে অবধি (এখন তারা হাল ছেড়ে এই অধমকে খরচের খাতায় লিখে দিয়েছে)। নিজের মত যুক্তি সাজাতাম বটে (বুদ্ধদেবের গল্পও বলেছি কয়েকবার), তবে আপনার লিস্টিটা তখন জানা থাকলে কাজে দিত। 🙂

    1. আপনার পুনর্মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ 🙂
      আপনার যদি আমিষের সপক্ষে এবং/অথবা ভারতে নিরামিষাসীদের অর্বাচীনতা সম্পর্কে আরো যুক্তি দরকার হয়, অবশ্যই জানাবেন; প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অনেক হিসেব আছে৷ ভারতের গোবলয়ের দৌরাত্ম্যে চাপা আছে সে সব কথা৷ দক্ষিণী ব্রাহ্মণরা নিরামিষাসী বটে কিন্তু কট্টর হিন্দুত্ববাদী নয় এবং নিজেদের আমিষবিমুখতা জোর গলায় প্রচার করে না৷

    1. ‘বেবি কর্ন’ অবশ্য ‘খুকি মকাই’ও হতে পারে; উভলিঙ্গ চিন্তা করা উচিত ছিল আমার! আমার ওয়েব লগের চৌকাঠ মাড়ানোর জন্য ধন্যবাদ।

      1. ভাবছিলাম যে, খুকি মকাই কেন হলো না। যা হোক, সদরদরজার কড়া নাড়তে পেরে আমারও ভোগ জুটলো মন্দ না। শুভকামনা।

      2. আমার সদর তো সর্বদা হাত করে খোলা, অবারিত, যখন খুশি উঁকি মারতে পারেন!
        ঠিকানা সকল:
        ইংরেজি aniruddhasen.wordpress.com
        মিশ্র apsendotcom.wordpress.com
        বাংলা jonakiblog.wordpress.com

  3. খুব, খুব ভালো লাগলো দাদা। সারাটা জীবন আমিষ খাবার খেয়ে এসেছি। ভয় করে, জীবনের শেষ ক’টা দিন সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে শাকপাতা খেয়ে ঢেকুর তুলে, মৌরি চিবিয়ে, লোক দেখানো পরিতৃপ্তির হাসি না হাসতে হয়। রাজশেখর বসুর রাজভোগ গল্পের মতো রেস্তোঁরায় গিয়ে লেবু বার্লির খোঁজ না করতে হয়। খোকা মকাই কথাটা খুব ভালো লাগলো।

  4. ত্রৈলোক্য নাথের ডমরুচরিতে দেখতে পাই :-

    গোমাংস, মেষমাংস, অশ্বমাংস, মহিষমাংস, গোধামাংস, ছাগমাংস, উষ্ট্রমাংস ও মৃগমাংস, ―এই অষ্টবিধ মাংসকে মহামাংস বলে৷ এই সকল মাংসই দেবতাদিগের প্রীতিদায়ক ‘ওঁ প্রতদ্বিষ্ণুস্তরতে’ অথবা ‘ওঁ ব্রহ্মর্পণমস্তু’ এই মন্ত্রে সংশোধন করিয়া লইলে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণও এই সমুদয় মাংস ভক্ষণ করিতে পারে৷
    পক্ষীমাংসকে তন্ত্রশাস্ত্র অধম মাংস বলেছে ।

    মাছের ব্যাপারে বলি :-

    ইল্লিশ, খল্লিস, ভেটকী, মদগুর এব চ।
    রোহিত রাজেন্দ্র, পঞ্চমৎস্যা নিরামিষাঃ।।

    অস্যার্থঃ- ইলিশ, খলসে, ভেটকী, মাগুর এবং রুই- এই পাঁচরকম মাছ নিরামিষ। খেলে দোষ নেই!
    সাথে, আরও জুড়ে দিলেন:- কাঁচকলা দিয়ে রান্না করলে, সব রকম মাছই খাওয়া যায়!

    1. Thanks for reading my post. While I agree fully with your comments, it saddens me to see that most Indians, Hindoo by birth, deny the lessons of history and archaeology. Man was DESIGNED as an omnivore, began tribal/social life as hunter-gatherers (pastoral), progressed to paleontology- and chalcolithic stages while nourishing on both non-veg and veg victuals. Vegetarianism was a very late development, originating from edible animal shortage at some remote recess of the world. The vegetarians invaded India from “abroad” and remained a minority well up to the era of Siddhartha and Mahavira, for there were no mention of vegetarianism as a virtue in the Vedas, Vedantas and the two epics. And we Bongs are decidedly AustroAsiatic (adivasi tribals) who were always non-veg. Yet, half-educated idiots like Maneka campaigns hard to proscribe meat-eating. And the Hindutvavadis of northwest champion her despite being rank minors. Who reads scriptures in the original — NaMo and his cohorts? The health-related issues too are more often mere canards, under-researched and exaggerated.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s