ঈদের চাঁদ আর কাস্তে ¬ স্ক্র্যাপবুক-বৃত্তের বাইরে

একজন অতি জনপ্রিয় কবি ক্ষুধাধিক্যে চাঁদকে ঝলসানো রুটির উপমায় টেনেছেন…

“কবিতা আজকে তোমাকে দিলাম ছুটি,

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,

পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”

নানা কারণে তিনি এখন আর আমার প্রিয় কবি নন। তবে অন্তত একজন বাঙালি কবি যিনি, অধিকন্তু, দীর্ঘকাল ধরে আমার পরম প্রিয় (অর্থাৎ চিরকাল তা ছিলেন না), চাঁদকে কাস্তের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আসন্ন ঈদের পক্ষে তুলনাটা লাগসই — প্রতিপদের ঈদের চাঁদ (অথবা দ্বিতীয়া বা তৃতীয়ার) যতটা কাস্তেসদৃশ, গর্ভিনীর মত ক্রমস্ফীতায়মান চাঁদ ততটা নয়; পোড়া রুটির পূর্ণিমা চাঁদ তো সকলঙ্ক বৃকোদরা!

আমার ধারণা, মার্ক্সসচেতন আরো অনেক বাঙালি কবি অনুরূপ তুলনা করে থাকবেন।

পাঁচ দশকাধিক আগে, ২০২ রাসবিহারী অ্যাভ়িনিউয়ের পাঁচ নম্বর ফ্ল্যাটনিবাসী রবীন্দ্রনাথ সেন — আমার কাব্যচেতন জ্যেঠা — সুশীল রায় সম্পাদিত ধ্রুপদী  পত্রিকার জন্য একটি প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেছিলেন: বাংলা কবিতায় কাস্তের সঙ্গে চাঁদের উপমা কে আগে দিয়েছেন — সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, না দিনেশ দাস, তাই নিয়ে গবেষণামূলক, গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ। এই বশংবদ তখন জ্যেঠা-জ্যেঠির তত্ত্বাবধানে কলেজে পড়ে। সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেই তার প্রথম পরিচয়। ভালো লেগেছিল…

“কৃষ্ণ চূড়া নিষেধে মাথা নাড়ে,

কুলায় খোঁজে শুক,

চৈত্র শেষ সূচিত হাড়ে হাড়ে —

সূর্য অধোমুখ৷”

তাঁর কাস্তে আর চাঁদের খটোমটো কবিতাটা প্রথম দর্শনে মনঃপুত হয়নি, মনে হয়েছিল যেন যবনে নিবিদ বলছে…

“আকাশে উঠেছে কাস্তের মত চাঁদ,

এ যুগের চাঁদ কাস্তে;

ছায়াপথে কোন অশরীরী উন্মাদ

লুকালো আসতে আসতে৷

স্ফীত ধমনীতে ঘোরে অনামিক শঙ্কা,

হৃদয়ারণ্যে বাজে বর্বর ডঙ্কা,

ছাই হয়ে যায় প্রতীকী স্বর্ণলঙ্কা

নির্বাণ সূর্যাস্তে৷

হঠাৎ হাওয়ায় হাতুড়ির প্রতিবাদ,

এ যুগের চাঁদ কাস্তে৷…”

ছন্দ অবশ্যই অনবদ্য, তবে নতুন নয় — রাবীন্দ্রিক৷ আমার ধমনী স্ফীত হয়নি, বরং ছন্দের শ্বাসাঘাত আর দন্তুর শব্দচয়ন আমার কাঁচা মননে বর্বর ডঙ্কার মত শুনিয়েছিল। তা ছাড়া, আমার সে বয়সের পক্ষে, অমার্জনীয়রূপে অমার্ক্সীয়। সুধীন্দ্রনাথের কবিতা স্কচ হুইস্কির মত, অর্জিত স্বাদ; সইয়ে সইয়ে ভালো লাগতে শুরু করলো কয়েক বছর বাদে।

আজকের পোস্টের জন্য — আপসোস রয়ে গেল — দিনেশ দাসের কবিতাটা আমি বেমালুম ভুলে গেছি (সত্যিই কি বুড়ো হয়ে গেলাম?), তবে জ্যেঠা যেদিন প্রবন্ধটার প্রথম খসড়া সংশোধন করছেন, আমি তখন কাছে বসে সাত পুরনো শনিবারের চিঠির বাঁধানো খন্ড গুলো ঘাঁটছিলাম৷ হবি তো হ, হঠাৎ দেখি বিনা নামে লেখা একটা ব্যাঙ্গাত্মক পদ্য, ছড়া বলাই ভালো, তার প্রথম দিকটা ছিল (মনে আছে আজও)…

“আকাশে উঠেছে চাঁদ, ঠিক যেন কাস্তে,

আজ বড় সাধ যায় হাঁচতে ও কাশতে।”

বাকিটা যে একদম মনে নেই, তাতে তামাম দুনিয়ায় কারু কোনও ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। (নামান্তরালটা কার — জানার দরকার বোধ করিনি৷ পরে বোধহয় জ্যেঠাই বের করেন, ছড়াটা স্বয়ং সজনীকান্ত দাসের লেখা।) আবিস্কার মাত্র আমি লিখনরত জ্যেঠার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি, “দেখো, দেখো, ওই দুজনের চেয়েও পুরনো কবিতা এটা!” অতঃপর প্রবন্ধটা আমূল পাল্টাতে হয় জ্যেঠাকে। সেই থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আরও কেউ কেউ নিশ্চয়ই একই উপমা ব্যবহার করেছেন — আগে এবং পরে।

বলতে ভুলেছি, জ্যেঠার প্রবন্ধটা নবরস সিঞ্চনে তারিফ পেয়েছিল খুব!

আজ এত কথা ফেঁদে বসলাম কারণ আমার ব্লগ সাইট খুলতেই দেখি, বাংলাদেশের আফ়সার নিজ়াম (afsarnizam.com) তাঁর ঈদের ছড়া পাঠিয়েছেন।

Advertisements

2 thoughts on “ঈদের চাঁদ আর কাস্তে ¬ স্ক্র্যাপবুক-বৃত্তের বাইরে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s