কবিতার স্ক্র্যাপবুক

কৈশোর পেরিয়ে সদ্য যৌবরাজ্যে পা দিতে না দিতে একটা আটপৌরে খাতা খুলেছিলাম—কবিতার স্ক্র্যাপবুক। বাঁধানো নয়, কাগজ-মলাটের রুলবিহীন সরু খাতা, পড়ুয়াদের কাজে লাগে, যত্র তত্র কিনতে পাওয়া যায়; তাতে তামাদি হয়ে যাওয়া পত্রপত্রিকা থেকে পছন্দের কবিতা কেটে কেটে সেঁটে রাখতাম, কখনও গঁদের আঠায়, কখনও বা বাসি ভাতের। সন তারিখ নিশ্চয় করে বলতে পারবনা, তবে সম্ভবত আমরা যখন সুহাস সেনগুপ্তের কেওটালাটবাগানের বাড়িতে ভাড়া ছিলাম—সে হবে ১৯৬৭-৬৮।

মনে আছে, সে সব কবিতার কাট পীস অনেকদিন থেকেই জমাচ্ছিলাম: হয়ত বা বাবার মৃত্যুর পর প্রথম বাড়ি বদলের ধাক্কায়, হয়ত ভেবেছিলাম আমার ডাকটিকিটের সযত্নসংগ্রহ সমেত আরও অনেক প্রিয় জিনিস চিরতরে হারিয়ে যাবে যাযাবর বৃত্তির ঝোঁকে। জমানো কবিতার ছেঁড়া পাতার কয়েকটাতে সংগ্রহসুত্র ও তারিখ দেয়া ছিল, কয়েকটা বেমালুম বেওয়ারিশ।

প্রথ যে কবিতাটা সেঁটেছিলাম সেটা মি চক্রবর্তীর সোয়াইটজরের মহাপ্রয়াণে (সমুজ্জ্বল/ সেই চৈতন্যের ব্যাপ্তি দৃষ্টির অতীতে আজ অস্তগত,/ অন্যতর শুভ্রালোকে কোথায় উদয় তার এই ক্ষণে/ আমরা জানিনাডেটলাইন: স্টেন, ৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫)বেরিয়েছিল ২৫শে সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫র দেশপত্রিকায়। গুগল করে দেখলাম, শোয়াইৎজ়র মারা গিয়েছিলেন ৪ সেপ্টেম্বরে; কুড়ি দিনের মধ্যে বিদেশ বাসী মি চক্রবর্তীর কবিতা ছেপে বেরিয়ে গেলকতখানি তৎপরতা!

এই খাতাটার একটা অদ্ভুত বদভ্যাস আছেযখনই খুঁজি, চট করে লুকিয়ে পড়ে, খুঁজে পেতে কয়েকটা বছর গড়িয়ে যায়। তাই হয়ত ১৯৬৭র পর তার বাকি পাতাগুলো সাদা। এবারেও, দীর্ঘ অদর্শনের পর, জীর্ণ ও দষ্ট অবস্থায় খুঁজে পেলাম বাতিল ব্রীফ়কেসের অধিকতর বাতিল কাগজের মধ্যে। ভাগ্যিস দেখলাম, লে হয়ত কর্পোরেশনের জঞ্জালগাড়ি মারফৎ ধাপা ঘুরে আজেবাজে খবর ছাপা দৈনিক হয়ে ফিরে আসত অচেনা কলেবরে!

এই খাতাটা রত্নগর্ভ, ঠিক মত সাজালে অনেকগুলো ওয়েব-লগ পোস্ট হতে পারে। তবে তার শেষ ছেঁড়া পাতার (সম্ভবত ১৯৬৭) চারটে কবিতার দুটো আমার প্রিয় কবিদের লেখাশরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের লক্ষ্মী রাজা আর তারাপদ রায়ের শিকারী কুকুরের সঙ্গেআজকের পোস্টে তবে লক্ষ্মী রাজা থাকুক মসনদে!

রাজা, তোমার বাড়ির সামনে প্রকান্ড গেট

ঢুকতে গেলে থমকে দাঁড়াই : মাথাটা হেঁট

দুই দারোয়ান প্রশ্ন করেকোথায় যাবি?

জানি, তোমার দরজা খোলার মতন চাবি

নেই, তবু তো ইচ্ছে করে, রাজার কাছে গিয়ে দাঁড়াই,

বলিঅনেক কথা আছে, যে-কথা কেউ তোমার সঙ্গে

সাহস করে বলতে চায়না; রাজা, নিত্য তিন প্রহরে

তিনশো ভৃত্য শাসন করো, চতুর্থটি কেমন কাটাও?

একলা শুয়ে? … একটি নটী কিংবা সখা থাকলে তোমার

নির্জনতা দুর্বিষহ লাগত না গো! রাগ করলে?

লক্ষ্মী রাজা, বেরিয়ে এসো, বেরিয়ে উচ্চকন্ঠে কহো

এই ভিখারীর সঙ্গে আমার অনেক কথা,

গোপন কথা ছিল, তোমরা পথ ছাড়ো, যাও,

এই ভিখারীর সঙ্গে আমার নির্জনতা—

প্রাসাদ ভর্তি ভৃত্য, আমায় এক-মূহুর্তে স্বাধীনতা

ফিরিয়ে দাও

[লক্ষ্মী রাজা, শরৎকুমার মুখোপাধ্যা]

বেশ বোঝা যাচ্ছে, আজ পুনর্মুদ্রণের কথা উঠলে শরতের কবিতার আঙুল নানা সংশোধনের জন্য নিসপিস করত; কিন্তু যেমনটা ছাপা হয়েছিল তার ঐতিহাসিক মূল্য তো সংশোধনীয় নয়, তাই যেমনটি ছিল তেমনটিই থাক!

[My other blog sites are at <aniruddhasen.wordpress.com> and <jonakiblog.wordpress.com>.

Advertisements

4 thoughts on “কবিতার স্ক্র্যাপবুক

      1. Yes…that could be… as such it is worthwhile to compile all your creative writings / snippets under different categories but under one cover… as then only it would reveal your versatility & wide reach to different arena…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s