কালোর বই (কিন্তু ছড়াগুলো মামার) – সুনীলচন্দ্র সরকার

আমার জ্ঞানত সুনীল সরকার এই একটাই ছোটদের বই লিখেছেন; আর কেন লেখেননি কে জানে! সুনীল মূলত কবি এবং অনন্যসাধারণ ছড়াকার কালোর বই পড়ে জানা গেল তিনি কল্পগল্পও ভালো বাঁধেন ছড়া দিয়ে কাহিনি মেখে, তাতে রসের ময়ান দিয়ে ঠাসা ময়দার মত মোলায়েম তাঁর কালোর বই  (পিছ মলাটে বক্স করে লেখা আছে দিগন্ত,  প্রকাশন সংস্থার নাম হয়ত), যদিও পুস্তিনার পরিচিতি বলছে, কিন্তু ছড়াগুলো মামার!

যদ্দুর মনে পড়ে, পৌষ মেলার সময় একবার কঙ্করদার (ক্ষেমেন্দ্রমোহন সেন) মানি ব্যাগ হারিয়েছিল; সেটা খুঁজে পাই আমি সে হবে প্রায় বছর ষাটেক আগেতার বকশিসস্বরূপ বিশ্বভারতী স্টল থেকে কঙ্করদা আমাকে কিনে দিয়েছিলেন জগদীশ বসুর অব্যক্ত,  আমার বয়সের পক্ষে একটু বেশি ভারি; তারই ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাবা দিয়েছিলেন শক্ত মলাটের কালোর বই — সাদার ওপর সবুজ আর লাল দিয়ে অপটু হাতে ফিঙে, ছিট কোকিল, চড়াই, বেড়াল, ভুলো কুকুর, ছাগল, বলদ আর খরিশ গোখরো আঁকানয়নশোভন নয় দেখে আমার মনটা খারাপ হয়েছিল, মনে আছে তারপর মেলায় কালোর দোকানে বালির চপ আর পান্তুয়া খেতে খেতে কালোর বইয়ের দুচার পাতা উল্টোতে না উল্টোতে প্রেমে পড়ে গেলাম বেমালুমকাঁঠালের আঠার মত সে প্রেম, দেখছি, আজও ছাড়েনি, তবে মাঝখানে কয়েক বছর সুপ্ত ছিল!

এই তো দিন আগে বিবিধ সুটকেস-ব্রীফকেসে বছর বছর জমা জঞ্জাল (ইংরেজিতে যাকে বলে দ্য ডেট্রিটাস অভ মডার্ন লাইফ) নির্মম হাতে ফেলতে গিয়ে কালোর বইয়ের সেই কপিটা বেরুলো অবশ্যই জীর্ণ, পাতাগুলো হেমন্তের ঝরাপাতার মত আলগা, সামনের দুয়েকটা পরিচিতির পাতা নেই, কিন্তু অবশ্যই পাঠযোগ্য কাল রাতে আবার পড়ে ফেলে দ্বিতীয় শৈশবে পৌঁছে গেলাম প্রায় মনে পড়ল, আমার দশ বছরের ছোট ভাই বুগনুর যখন দুতিন বছর বয়স, আমাদের শাগঞ্জের ১১৬ নম্বর বাড়ির মাঝের ঘরে (যেটা আমার জীবনে প্রথম নিজের ঘর) আমি চিত হয়ে হাঁটু উঁচু করে শুয়ে চেঁচিয়ে কালোর বই পড়ছি (যেমন পড়তাম আরো অনেক বই), আর বুগনু আমার পেটে পা রেখে হাঁটুর ওপর বসে সাগ্রহে শুনছে একই বই বারংবার

সোন সোন ছোকরা সোন

চাস কি তুই সাসতি কোন?

সনিবার তায় বৈশাখে

(তুই) ম্রেছিস আমার সেজদাকে!

সারা সিত্কাল উপুসি ভাই

সালিক বাসায় সেঁধুলো তাই

মানুসের কিছু করেনি দোস,

হিংসুলি তবু, এত সাহস!

কাঁদিস কি হাত জোড় করিস

সেখাই আজকে সাপের বিস…”

এই অবধি পরলেই বুগনু পা দিয়ে আমার পেটে ঢুঁ মেরে বলত, “আবাল, আবাল! সেসব কথা আমার সেই জোনাকিরা  ব্লগে বলেছি; সাহসী এবং কৌতূহলী পাঠকের জন্য অতিদীর্ঘ <jonakiblog.wordpress.comদ্রষ্টব্য

কিন্তু আপনারা কি জানেন যে যে চড়াই জাতটা কলকাতা থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে (যেসব লোক পরিবেশ দূষণকে দোষ দিতে চান না, তাঁরা মোবাইল ফোনের তরিচ্চুম্বকীয়তাকে দোষেন) তাদের কতটা আত্মসম্মানবোধ? অপমানে ঝলসে উঠে তারা

কখনো উড়ে, কখনো এক পায়ে নেচে, পাখা ঝাপটে, গলা ফুলিয়ে উত্তেজিতভাবে চেঁচাতে লাগলো –

চিকি চিকি চাকা চিড়িক

বেধেছে বেধেছে হিড়িক

খবর ছড়াই, চড়াই! চড়াই!

চ চ চ চঃ   

চ চ চ চঃ

সভা! সভা!

চিররপ

চিয়ার আপ!

আজকের বাংলার রাজনৈতিক দলগুলোর মতই ঝগড়ুটে, মারকুটে, বাকসর্বস্ব এবং প্রচারে তৎপর!

তারপর তাদের সমবেত প্রার্থনা হলো চটকীয় সংস্কৃতে

কিরিকিচিকিচি চিকারা চিকারা চুয়া

একজন প্রশ্ন করে

বলো কি হয়েছে? কি কেড়ে নিয়েছে?

ঠুকরেছে নাকি? কি গাল দিয়েছে?”

তার উত্তর

বলেছে ফাজিল, বলেছে মুখ্যু,

তাতেও তেমন করি না দুখ্যু,

কিন্তু ভাইরে কথাটা শুনছ

চড়াই জাতকে বলেছে উঞ্ছ!

এমন একটা বই যে কোনও ভাষার সাহিত্যেই দুর্লভ, কিন্তু গুগ করে পেলামনা, ফ্লিপকার্ট বা অ্যামাজ়নেও নেই এটা যদি বাঙালির লজ্জা না হয় তবে কার?

My two other blog sites are <aniruddhasen.wordpress.com> and <jonakiblog.wordpress.com>

Advertisements

One thought on “কালোর বই (কিন্তু ছড়াগুলো মামার) – সুনীলচন্দ্র সরকার

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s