আর্যকুমার সেন (১৯১২ – ১৯৬৫)

খুলনার ভৈরব নদের কিনারে পয়োগ্রাম নামে এক অজ পাড়াগাঁ আছে। সেখানে সেনেদের পশ্চিমবাড়িকে লোকে বলত জাতিচ্যুত, কারণ সে বাড়ির অনেকেই জাতব্যবসা ছেড়ে বিবিধ জ্ঞানের মূলত সাহিত্যের চর্চা করতেন। সেই বাড়িতে জন্মেছিলেন আর্যকুমার; তাঁর বাবা (শচীন্দ্রনাথ) ডাক্তার আর মা (সুধা) সাহিত্যানুরাগী ও গোপন কবি। বাপের জীবিকা সূত্রে তাঁর ছেলেবেলা কাটে বীরভূমে (মহেশপুর, মুরারই) ও মুর্শিদাবাদে (নসিপুর)। মুর্শিদাবাদ স্কুল থেকেই তিনি প্রবেশিকায় উত্তীর্ণ হন সব বিষয়ে লেটার পেয়ে; শুনেছি, বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর প্রাপ্ত নম্বর দীর্ঘকাল রেকর্ড হয়ে ছিল।

সেই দেয়ালের লিখন তিনি নিজেও পড়তে পারেননি; তাই, বাপের জটীল অসুস্থতাজনিত অর্থাভাবের মধ্যে, জলপানির খাতিরে, বিজ্ঞান নিয়ে আই.এসসি পড়েন বঙ্গবাসীতে, পদার্থবিজ্ঞানে বি.এসসি স্কটিশ চার্চ কলেজে, এবং এম.এসসি ইউনিভার্সিটি কলেজ অভ সায়েন্সে যদিও এই অন্তিম পর্বটি অর্থনৈতিক কারণে শেষ হয়নি। তারপর, যেসব চাকরি তিনি করেছেন তার কোনওটাই  তাঁর অধীত বিদ্যার বা যোগ্যতার উপযোগী নয়।

ইতোমধ্যে সাহিত্যের আঙিনায় ঢুকে পড়েছেন। সে যুগের নামকরা পত্রপত্রিকায় ছোটগল্পের সম্ভার নিয়ে তাঁর আত্মপ্রকাশ। প্রবাসীতে পঞ্চশস্য শিরোনামে নিয়মিত একটি ফিচার লিখতেন তিনি, সজনীকান্ত দাসের শনিবারের চিঠিতে নিয়মিত লিখতেন৷ নিজেই বলতেন, “সে সব ছিল উঞ্ছবৃত্তি

দ্বিতীয় যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠায় তিনি রাজকীয় ভারতীয় বিমানবাহিনীতে স্বল্পমেয়াদি কমিশনে ফ্লাইং অফিসর হিসেবে যোগ দেন, পরে স্কোয়্যাড্রন লিডার পদে উন্নীত হন। কোয়েটা-কোহাট-সারগোদা পরে পাকিস্তানে ঢুকে যায়, ব্রহ্মদেশ তখনই বিভুঁই সে সব ছিল তাঁর রণক্ষেত্র।

ইত্যবসরে, রঞ্জন পাবলিশিং হাউস অভিনেতা  (চৈত্র, ১৩৪৭, মূল্য দুই টাকা) নামে তাঁর ছোটগল্পের একটি সংকলন বের করে তখনই সেটা তাঁর প্রকাশিত রচনাসমূহের ভগ্নাংশ মাত্র। ব্রহ্মে থাকাকালীন রচিত, নাগরী   নামের একটি পান্ডুলিপি তাঁর পারিবারিক সংগ্রহে আছে পুরোটাই তাঁর অনবদ্য ক্যালিগ্রাফিতে লেখা, ছাপার অক্ষরের সঙ্গে তফাৎ বোঝা দায় আসলে শৃঙ্গারশতকের আংশিক পদ্যানুবাদ। তখন তিনি সংস্কৃত সাহিত্যে মশগুল। পরে তাঁর লীলাসঙ্গিনী  বেরোয় বেঙ্গল পাবলিশার্স (শ্রাবণ, ১৩৫৫/মূল্য চার টাকা) থেকে, মূলত কালিদাসের ঋতুসংহার থেকে কয়েকটি শৃঙ্গার কবিতার পদ্যানুবাদ, তাতে রচনার ইতিবৃত্ত দেয়া আছে: “রচনাকাল ফেব্রুয়ারিমার্চ, ১৯৪৫; রচনাস্থান ব্রহ্মদেশ (বিমানযুদ্ধক্ষেত্র); উদ্দেশ্য  escapism”।  প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী; জলরঙের একটি ছবি নন্দলাল বসুর আঁকা গৌরবর্ণ আর্যপুরুষের সঙ্গে আলাপরতা শ্যামলীনারী আর্যকুমার ও শ্যামলীর বিবাহে গাত্রবর্ণ ওলট পালট করে শিল্পীর রসিকতার উপহার।  

প্রসঙ্গত, শ্যামলী ছিলেন হরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও রেণুকার তৃতীয় কন্যা, এবং রেণুকার পিতা ক্ষিতিমোহন সেন। এখানে উল্লেখ করতে বাধা নেই যে আর্যের বাবা শচীন্দ্রনাথ ও শ্যামলীর মাতামহ ক্ষিতিমোহন কিছুকাল মেডিক্যাল কলেজে সহপাঠী ছিলেন (বিধানচন্দ্র রায়ও তাঁদের সঙ্গে পড়তেন), যদিও ক্ষিতিমোহন বৃহত্তর জ্ঞানের তাগিদে সে পাঠ সাঙ্গ করেননি।

যুদ্ধান্তে তিনি কলকাতার অদূরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আধিকারিকের কাজ করেছেন আমৃত্যু, তার মধ্যেই কিছু কিছু লিখেছেন —  অধিকাংশ ইংরেজিতে।

ছবিও আঁকতেন আর্যকুমার, সচরাচর পেন্সিলে, কাঠকয়লায় বা জলরঙে আঁকা মানুষের প্রতিকৃতি। তাঁর পারিবারিক সংগ্রহে আছে সেসব ছবি আর কয়েক ট্রাঙ্ক বোঝাই তাঁর সাদাকালো আলোকচিত্রের সম্ভার —  স্বহস্তে প্রস্ফূটিত এবং এনলার্জ করা।

আরো আছে অনেক অপ্রকাশিত বাংলা ও ইংরেজি পান্ডুলিপি; হারিয়ে গেছে বিভিন্ন সাময়িকীতে বেরুনো তাঁর বিবিধ রচনা। বার্ষিক আনন্দবাজারে (১৩৫৩) বেরিয়েছিল তাঁর বড় গল্প, স্বর্ণযজ্ঞইতিহাসের পটভূমিতে, আজও হয়ত উদ্ধারণীয়, কিন্তু দেশি-বিদেশি অনেক লুপ্ত কাগজে বেরুনো তাঁর টুকরো লেখা হারিয়ে গেছে হয়ত চিরতরেই।

My other blogs are available at <aniruddhasen.wordpress.com> and <jonakiblog.wordpress.com>

Advertisements

7 thoughts on “আর্যকুমার সেন (১৯১২ – ১৯৬৫)

  1. শিক্ষার মোক্ষলাভ যে শুধু চাকরীতে সীমাবদ্ধ নয় – তা ও৺নাদের জীবন ফিরে দেখে বোঝা যায় । আমি আমার বাবা’র কাছ থেকে শনিবারে’র চিঠি সম্ব্ন্ধে শুনেছি । তখনকার অনেক প্রতিভা’র স্ফুরণ ওখানে দেখা যেতো ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s